একজন শিক্ষক—তিনি শুধু একজন চাকরিজীবী নন, তিনি একজন জাতি গড়ার কারিগর। একজন শিশুর হাতে যখন প্রথম বই তুলে দেওয়া হয়, তখন সেই শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠার দায়িত্বটা যার ওপর পড়ে, তিনি হলেন শিক্ষক। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রশাসক, বিচারক—সব পেশার ভিত্তি তৈরি হয় একজন শিক্ষকের হাত ধরেই।
আরও পড়ুন:
যে সকল পরীক্ষা ডিসেম্বরে নেওয়ার পরিকল্পনা করলেন শিক্ষামন্ত্রী
অথচ আজকের বাস্তবতা হলো, সেই শিক্ষকই সমাজে সবচেয়ে অবহেলিত, সবচেয়ে কম বেতনের একজন কর্মজীবী।
এটা শুধু একটি বৈপরীত্য নয়—এটা একটি জাতীয় লজ্জা।
আমরা বড় বড় কথা বলি—“ডিজিটাল বাংলাদেশ”, “স্মার্ট বাংলাদেশ”, “উন্নত রাষ্ট্র”—কিন্তু যে মানুষগুলো এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি করছেন, তাদের জীবনযাত্রা কি সেই স্বপ্নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
একজন শিক্ষক মাস শেষে তার পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করতে হিমশিম খায়। বাজারের দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে একজন শিক্ষককে অনেক সময় সম্মানের চেয়ে বেঁচে থাকার লড়াইটাই বেশি করতে হয়।
যেখানে অন্য পেশাজীবীরা ধীরে ধীরে বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা, সামাজিক মর্যাদায় এগিয়ে যাচ্ছেন, সেখানে শিক্ষকরা যেন একই জায়গায় আটকে আছেন। বরং অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছেন।
একজন নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক যে বেতন পান, তা দিয়ে একটি পরিবার চালানো আজ প্রায় অসম্ভব। অথচ এই শিক্ষকই প্রতিদিন ক্লাসে দাঁড়িয়ে জাতির ভবিষ্যৎ গড়ছেন।
প্রশ্ন হচ্ছে—
👉 যে মানুষ জাতির মেরুদণ্ড গড়ে, তার নিজের মেরুদণ্ড কেন এত দুর্বল করে রাখা হয়েছে?
সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা কমে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো তার আর্থিক দুর্বলতা। বাস্তবতা হচ্ছে, টাকা সম্মান তৈরি করে না, কিন্তু টাকার অভাব সম্মান কেড়ে নেয়। একজন শিক্ষক যখন আর্থিক সংকটে থাকেন, তখন সমাজের অনেকেই তাকে অবহেলার চোখে দেখে। শিক্ষকের কণ্ঠে তখন শক্তি থাকে না, তার আত্মবিশ্বাস কমে যায়, যা সরাসরি প্রভাব ফেলে শিক্ষার মানের ওপর।
অনেক উন্নত দেশে শিক্ষকতা সবচেয়ে সম্মানজনক ও উচ্চ বেতনের পেশাগুলোর একটি। কারণ তারা বুঝেছে—একজন ভালো শিক্ষক মানেই একটি শক্তিশালী জাতি। কিন্তু আমাদের দেশে সেই উপলব্ধির ঘাটতি এখনও স্পষ্ট। আমরা এখনও শিক্ষকদের দিয়ে “ত্যাগ” আশা করি, কিন্তু তাদের প্রাপ্য “প্রতিদান” দিতে চাই না।
এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ ভয়াবহ হতে বাধ্য। মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসতে আগ্রহ হারাবে। যারা আসবে, তারা বাধ্য হয়ে আসবে, ভালোবেসে নয়। আর যে পেশায় ভালোবাসা নেই, সেখানে গুণগত মান কখনোই তৈরি হয় না।
👉 তাই এখন সময় এসেছে বাস্তব সিদ্ধান্ত নেওয়ার।
শিক্ষকদের বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাস করতে হবে।
তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে জাতীয় বাজেটে।
শিক্ষকদের সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা সুবিধা, বাসস্থান সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—শিক্ষকতা পেশাকে দেশের সবচেয়ে সম্মানজনক ও আকর্ষণীয় পেশা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
কারণ একটি সত্য কখনো বদলাবে না—
👉 শিক্ষক ভালো হলে জাতি ভালো হবে, শিক্ষক দুর্বল হলে জাতি দুর্বল হবে।
আজ যদি আমরা শিক্ষকদের সম্মান ও প্রাপ্য বেতন নিশ্চিত না করি, তাহলে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। তারা প্রশ্ন করবে—
“যারা আমাদের মানুষ বানানোর কথা ছিল, তাদেরকেই তোমরা কেন অবহেলা করলে?”
শেষ কথা একটাই—
শিক্ষককে বাঁচান, শিক্ষা বাঁচবে।
শিক্ষা বাঁচলে, দেশ বাঁচবে।
এম এ সাইদ (তন্ময়)
সম্পাদক,
শিক্ষার বাজার