এম এ সাইদ (তন্ময়) : বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে গরিব মানুষের সন্তানদের জন্য শিক্ষা দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। যে শিক্ষা হওয়া উচিত ছিল সবার জন্য সমান সুযোগের একটি শক্তিশালী ভিত্তি, সেটিই আজ বৈষম্যের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বৈষম্যের ভার সবচেয়ে বেশি বহন করছে গ্রামের গরিব, খেটে খাওয়া, পা ফাটা মানুষের সন্তানরা।
আরো পড়ুন:
৫০ ঊর্ধ্ব শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষণের আওতায় আনার নির্দেশনা শিক্ষামন্ত্রীর
একদিকে শহরের ধনী ও প্রভাবশালী পরিবারের সন্তানেরা সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নামমাত্র খরচে পড়াশোনা করছে, অন্যদিকে গ্রামের গরিব শিক্ষার্থীরা বাধ্য হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে—যেখানে ভর্তি ফি, মাসিক বেতন, কোচিং খরচসহ নানা ব্যয় তাদের পরিবারের জন্য এক অসহনীয় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
প্রশ্ন জাগে—এটা কেমন শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে গরিবদের জন্য শিক্ষা আরও বেশি ব্যয়বহুল, আর ধনীদের জন্য তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য?
এই বাস্তবতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সীমিত আসন, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং কেন্দ্রীয় শহরভিত্তিক সুযোগ-সুবিধা গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে প্রবেশ করছে, যেখানে মানসম্মত শিক্ষা পেতে হলে অর্থ ব্যয় করতেই হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, এই ব্যবস্থার ভেতরেই লুকিয়ে আছে সামাজিক বৈষম্যের বীজ। একজন গরিব কৃষকের সন্তান যদি শুধুমাত্র আর্থিক অক্ষমতার কারণে ভালো শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে সে কীভাবে তার মেধা ও যোগ্যতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করবে?
একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকারের উন্নত হয়, যখন সে তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকের জন্য সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে। কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে—গরিবরাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত।
এই বৈষম্যের আরেকটি করুণ দিক হলো শিক্ষক সমাজের অবস্থা। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা—যারা অল্প বেতনে, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে, তবুও জাতি গঠনের কাজে নিয়োজিত—তাদের জীবনমান অত্যন্ত কষ্টকর।
দেশের অন্যান্য পেশার তুলনায় তারা সবচেয়ে কম বেতন পান, অনেক সময় মাসের পর মাস বেতন বকেয়া থাকে। তাদের নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, নেই সম্মানজনক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা। অথচ তাদের হাতেই গড়ে ওঠে আগামী দিনের নেতৃত্ব।
এই পরিস্থিতিতে শিক্ষা জাতীয়করণ এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি গরিব মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার একমাত্র কার্যকর পথ। জাতীয়করণের মাধ্যমে রাষ্ট্র যদি সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে, তাহলে গরিব ও ধনীর মধ্যে শিক্ষাগত বৈষম্য অনেকাংশে কমে আসবে।
জাতীয়করণ বাস্তবায়িত হলে—
প্রথমত, গরিব পরিবারের সন্তানরাও সমান সুযোগ পাবে মানসম্মত শিক্ষার।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের জন্য নিশ্চিত হবে ন্যায্য বেতন ও সম্মানজনক জীবন।
তৃতীয়ত, শিক্ষা খাতে বাণিজ্যিক প্রবণতা কমে আসবে।
চতুর্থত, গ্রাম ও শহরের মধ্যে শিক্ষার ব্যবধান হ্রাস পাবে।
অবশ্যই এই পথ সহজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা। কিন্তু কঠিন বলেই যে এটি করা যাবে না—এই যুক্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বরং দেরি যত বাড়বে, বৈষম্যের দেয়াল তত উঁচু হবে।
আজকের শিশু-কিশোররাই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়বে। তাদের যদি আমরা সমান সুযোগ না দিই, তাহলে তারা কেমন সমাজ গড়ে তুলবে? একটি বৈষম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা কখনোই একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করতে পারে না।
অতএব, এখন সময় এসেছে গরিব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর, তাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার। শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মৌলিক অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করতে হলে আমাদের সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
শেষ কথা—
গরিবের সন্তান যেন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটিই হোক রাষ্ট্রের অঙ্গীকার।
👉 “আর কাল বিলম্ব নয়, শিক্ষা জাতীয়করণ এখনই বাস্তবায়ন করতে হবে।”